1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : raihan :
  3. [email protected] : sanowar :
  4. [email protected] : themesbazar :
পরিবহণ ভাড়া বেড়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে - Prothom News
শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

পরিবহণ ভাড়া বেড়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১
  • ৫৮ বার
Print Friendly, PDF & Email

প্রথম নিউজ ডেস্ক:

এ দেশের সাধারণ মানুষকে দেখার মতো কেউ বুঝি নেই, নেই বুঝি কোনো অভিভাবক। খুব সহজেই বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। সঙ্গত কারণেই মনে হয় আজকের বাংলাদেশ সর্বসাধারণের নয়, কেবলই গুটিকয় মানুষের; সে মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশের বেশি নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামবৃদ্ধি ঘটলে তা সব শ্রেণির মানুষকে সমভাবে প্রভাবিত করে না। পণ্যের দামবৃদ্ধিতে ভোগান্তির শিকার হন নিু ও মধ্য আয়ের মানুষ, উচ্চ আয়ের মানুষ নন। আজকের বাজারে দৃব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সাধারণ ক্রেতারা হাঁপিয়ে উঠছেন, কিন্তু তাদের কিছু করার নেই। ওই যে বললাম, তারা পুরোপুরিই অভিভাবকহীন, অসহায়। মানুষের এ অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে সরকার। তারা জানে যে, মানুষ তাদের ভোগান্তির প্রতিবাদে দাঁড়াতে অক্ষম। তাই তারা চরম ভোগান্তিমূলক কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও কোনো কুণ্ঠাবোধ বা দ্বিধা করে না।

সাধারণ কথা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। তেলসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার সময় সারা বিশ্ব থমকে থাকার পর আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে। এ নতুন করে কর্মময় হওয়াতে যে পরিমাণ তেলের প্রয়োজন বা চাহিদা, তার তুলনায় সরবরাহ কম। চাহিদার বিপরীতে জোগান কম থাকাতেই তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। কিন্তু তেলের দাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাড়লেও অভ্যন্তরীণভাবে কোনো দেশ দাম বাড়াবে কিনা তা নির্ভর করে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কমিটমেন্টের ওপর। দাম বাড়ানো না বাড়ানোর বিষয়টি নির্ভর করে কোন সরকার জনদুর্ভোগকে কতটা আমলে নেয় তার ওপর। আমাদের শাসকরা সাধারণ মানুষের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। দাম বাড়ার ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু গত চার-পাঁচ বছর বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম কম ছিল, তার সুফল কিন্তু আমরা ভোগ করতে পারিনি। সরকারের দ্বৈতনীতির খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

প্রশ্ন আসে যে, হঠাৎ করেই দাম না বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজার আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা যেত কিনা কিংবা বৃদ্ধির হার কমানো যেত কিনা। বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের কাজটি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তাদের ভাষ্য হলো, তেলের ঊর্ধ্ব মূল্যের কারণে গত মাসে বিপিসিকে ২৬ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। আমাদের লোকসানের হিসাবটাই দেওয়া হয়, মুনাফারটা না। গত ৭ বছরে বিপিসি জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন করে মুনাফা করেছে ৪৩ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এতখানি মুনাফার বিপরীতে বিপিসি মাত্র ২৬ কোটি টাকার লোকসান সহ্য করতে পারল না! না, পারল না। কেননা এ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবার মতো সময় ও ইচ্ছা ওপরওয়ালাদের নেই। সরকারেরও এখানে কিছু করার ছিল। জ্বালানি তেল আমদানি করতে গিয়ে বিপিসি বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারকে যে শুল্ক প্রদান করে, তার পরিমাণ আমদানি মূল্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ। প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে সরকারকে কর ও ভ্যাট দিতে হয় ১৯ টাকা। সরকার তা কমিয়ে তেলের দাম সমন্বয় করতে পারত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ডিজেল ও পেট্রোলের আবগারি শুল্ক কমিয়ে দাম সমন্বয় করেছে। এতে করে সরকারি আয় কিছুটা কমলেও ভোক্তাদের ভোগান্তি কমেছে যথেষ্ট পরিমাণে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভর্তুকি দিয়ে হলেও আরও কিছুদিন দাম স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজন ছিল।

তেলের দাম বাড়ানোতেই সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকল। সেখানেও কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলো না। তেলের দাম বাড়লে তো পরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধির প্রশ্নটি আসবে। তাহলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। না, তা না করেই ৪ নভেম্বরের এক ঘোষণায় ৫ তারিখ থেকে তেলের দাম বৃদ্ধি করা হলো। সব ধরনের যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেল, সারা দেশ হয়ে পড়ল অচল। লাখ লাখ মানুষের সে কী দুর্ভোগ! জল, স্থল সব পথ অবরুদ্ধ। ৭ নভেম্বর সরকারের সঙ্গে পরিবহণ মালিকদের আলোচনাতে ভাড়ার একটা রফা করে ৮ নভেস্বর থেকে পরিবহণ চলাচল স্বাভাবিক হয়। আলোচনা যদি করতেই হবে, তবে তা এক সপ্তাহ আগে হলো না কেন? তাহলে তো আমাদের চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হতো না। কিন্তু যেহেতু জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা নেই, তাই স্বেচ্ছাচারিতার শেষ নেই।

এবারে আসুন ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে। সড়কপথে সাধারণ মানুষের পক্ষে পরিবহণ মালিকদের সঙ্গে দরকষাকষির সরকারি সংস্থা হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং নৌপথে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ভাড়া বৃদ্ধির আলোচনায় তারা সাধারণ মানুষের কথা ভুলে গিয়ে মালিকদের পক্ষ নিয়েছে। ন্যায়সঙ্গত ভাড়া বৃদ্ধির কোনো যুক্তিই উপস্থাপিত হয়নি বরং মালিকরা যেভাবে চেয়েছে তাই হয়েছে। আমরা তার প্রমাণ দিতে পারব। আপনারা জানেন যে, পরিবহণ পরিচালন ব্যয় শুধু জ্বালানি তেল নয়। ব্যাংকঋণ ও সুদের কিস্তি, টায়ার খরচসহ গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, ফেরি ভাড়া, সেতুর টোলসহ সড়কপথের চাঁদা, গাড়িচালকসহ কাউন্টার ইত্যাদি খরচসহ মুনাফা ও জ্বালানি-এ হলো পরিবহণ পরিচালন ব্যয়। এক হিসাবে দেখা গেছে, মোট পরিবহণ খরচের মাত্র ৪০ শতাংশ হলো জ্বালানি খরচ। তাহলে পরিবহণ খরচের কেবল ৪০ শতাংশের দাম বাড়ানো হয়েছে, বাদবাকি ৬০ শতাংশ খরচ স্থির আছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে ২৩ শতাংশ। তাহলে মোট পরিবহণ ব্যয় বাড়ার কথা ৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার ভাড়া বেড়ে দাঁড়ানোর কথা ১০৯ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে অনেক বেশি। আগে ভাড়া ছিল প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৪২ পয়সা। নতুন ভাড়া হলো প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৮০ পয়সা। বৃদ্ধির হার প্রায় ২৭ শতাংশ, যা ন্যায়সঙ্গত বৃদ্ধির প্রায় তিনগুণ।

নৌপরিবহণের বেলায় ঘটেছে আরও অরাজকতা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ঢাকা থেকে বরিশালের ডেকের ভাড়া ছিল ২৫০ টাকা, তা করা হয়েছে ৩৫০ টাকা। অন্যদিকে কেবিন ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা, তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকা। সেখানে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ভাড়া এতটাই বৃদ্ধি করা হয়েছে, খোদ মালিকরাই বিব্রতবোধ করছেন। তারা নিজেরাই ৪০০ টাকা কমিয়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা নিচ্ছেন। কিন্তু আরও বেশি নেওয়ার আইনগত অধিকার তো মালিকদের হাতে রয়েই গেল। সুতরাং ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনোখানেই কোনো যুক্তির ওপর নির্ভর করা হয়নি।

ডিজেলের দামবৃদ্ধি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কৃষিতে। এখন শীতকালীন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। সামনে বোরো মৌসুম। আমাদের কৃষিতে সেচের ব্যবহার বেড়েছে বহুলাংশে। উল্লেখিত ফসল দুটি সেচনির্ভর। এ সেচনির্ভরতার কারণে ডিজেলের দামবৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। কমিয়ে দেবে লভ্যাংশ, যা থেকে কমে যাবে জীবনমান। সে ক্ষেত্রে সরকারকে নতুন কোনো প্রণোদনা কিংবা নগদ সহায়তার কথা ভাবা উচিত।

আমাদের দেশে কেরোসিনের ব্যবহারকারীরা অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী। বাড়ানো হয়েছে তার দামও। এমনিতেই তারা দু’বেলা ভালোমতো খেতে পায় না। তার ওপর গেল করোনার ধকল। ক্রয়ক্ষমতার নিুগামিতার মধ্যে আবার কোরোসিনের দামবৃদ্ধি! কীভাবে বাঁচবে তারা কিংবা যেভাবে বাঁচবেন তাকে ‘বাঁচা’ বলা যাবে কিনা সেটাই প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার দৃশ্যত এর বোঝা চাপাল পরিবহণ মালিকদের ওপর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ বোঝা চাপানো হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। এখন প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ এ বোঝা কার ওপর চাপাবেন? কোনো জায়গা নেই, নিজেদেরই তা হজম করতে হবে এবং তা করতে হবে বিনা বাক্যে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর...

ফেসবুকে আমরা…

© All rights reserved © 2020, prothomnews.com.bd